সচিবালয়ে নথি চুরির চার দশক : জিডিতেই সীমাবদ্ধ বিচার - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

সচিবালয়ে নথি চুরির চার দশক : জিডিতেই সীমাবদ্ধ বিচার

SS iT Computer

সচিবালয়ে নথি চুরির চার দশক : জিডিতেই সীমাবদ্ধ বিচার প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় থেকে নথি চুরির ঘটনা নতুন নয়। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বদলে দিতে বা তথ্য পাচারের উদ্দেশ্যে সচিবালয় থেকে ফাইল খোয়া যাওয়া বা চুরির ঘটনা অনেক। কখনো আমলারাই ফাইল সরিয়ে ফেলেছেন, কখনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের উদ্দেশ্যে সচিবালয়ের সঙ্ঘবদ্ধ চুরিও সংঘটিত হয়েছে।

এ নিয়ে দফায় দফায় জিডি ও মামলা হলেও সেগুলো নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগের তীর ছিল সচিবালয়ের আমলা ও কর্মচারীদের দিকে। এসব ক্ষেত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রক্ষা করতে আমলাদের তৎপরতার কথাও লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। দৈনিক আমাদের বার্তার অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চার দশকের ধারাবাহিকতা টানলে দেখা যায়, সচিবালয়ে যেকোনো চুরির ঘটনার পর বড়জোর থানায় সাধারণ ডায়েরি এবং দু-একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ,তদন্ত কমিটি গঠন-এরকম দায়সারা তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। অব্যাহতভাবে নথি চুরির ঘটনা ঘটে চললেও তা প্রতিরোধ বা প্রতিকারে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে নথি চুরির চেষ্টার কথিত অভিযোগে গত মে মাসে একজন সাংবাদিককে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। ছয়দিন কারাভোগও করেছেন তিনি। তবে গত ৪০ বছরে সচিবালয়ে নথি চুরির ঘটনায় সরকারি কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী কারাভোগ, চাকরি হারিয়েছেন বা দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তিভোগ করেছেন এমন নজির নেই।

চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে গত ১৭ মে যে মন্ত্রণালয়ের নথি চুরির চেষ্টার অভিযোগে সাংবাদিককে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলো, পাঁচ মাসের মাথায় সেই মন্ত্রণালয়েরই ১৭টি নথি গায়েব হয়ে যায়। আর বরাবরের মতোই মন্ত্রণালয়ের তরফে নথি চুরির বিষয়ে জিডিতেই সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, ‘নথিগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সিআইডি ওই ঘটনায় কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মাত্র। অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারের ঘটনাও সময়ের চাকায় চাপা পড়ে যাবে হয়তো। মানুষ ভুলে যাবে। ঘটনায় জড়িতরা আড়ালেই থেকে যাবেন।

এদিকে সচিবালয়ে চার দশকের ধারাবাহিক এসব চুরির ঘটনাকে রহস্যজনক এবং সর্ষের মধ্যে ভূত বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, চুরির ঘটনায় যথোপযুক্ত বিচার হলে, জড়িতরা শাস্তি পেলে অবশ্যই এটা বন্ধ হতো। কিন্তু এ যাবৎ এমন কিছু না হওয়ায় ঘটনা কেবল বাড়ছেই। যেমন আগে চুরি হয়েছে ১/২টি ফাইল। এবার এক সঙ্গে ১৭টি ফাইল গায়েব। তাও আবার এক মন্ত্রণালয়ের। যে মন্ত্রণালয় করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতা এবং কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে।

নথি চুরির খতিয়ান:

১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘৮১’র জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রমনা থানায় সর্বমোট ১৬১টি এজাহার দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মন্ত্রণালয়ের গার্ড, পিয়নসহ ৪র্থ শ্রেণির প্রায় ১০ জনকে আটক এবং বেশ কিছু সংখ্যক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এজাহারে, জরুরি ফাইল গায়েব, টাইপ রাইটিং মেশিনের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন স্টেশনারি সামগ্রী চুরি যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সংঘবদ্ধ দল এ চুরির সাথে যুক্ত। চোরদের হাতে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অফিস কক্ষ ও আলমারির ডুপ্লিকেট চাবি থাকতো। ফাইল চুরির এসব ঘটনা তদন্ত করতে গেলে একজন অপরজনের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে গেলে বিভাগীয় তদন্তের পর দোষীদের থানায় সোপর্দ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়ে পুলিশকে বিদায় করা হয়। এভাবেই দোষী লোকজন ছাড়া পেয়েছে।’ ইত্তেফাকের প্রতিবেদনটিতে নথিপত্র চুরি ও চোরদের রক্ষায় আমলাদের তৎপরতার চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে সচিবালয়ের প্রধান ভবনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৬টি কক্ষের তালা ভেঙে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল চুরি হয় মর্মে তৎকালীন গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়। চোরেরা রুমের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ এবং লোহার আলমারী ও ড্রয়ারের তালাও ভেঙে সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে পালিয়ে যায়। কেউ শাস্তি পেয়েছিলো কিনা তা অজানা।

এর একদশক পর ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুন দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ এ তিন বছরে সচিবালয়ে ১৬৩টির চুরির ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মন্ত্রী- সচিব, যুগ্নসচিব, প্রধান তথ্যকর্মকর্তাসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কক্ষে চুরির ঘটনা বেশি ঘটেছে। এরকম ১৭টি চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। এতে চুরির ঘটনাও উদঘাটন হয়নি। ফলে রাতের আঁধারে সচিবালয় অপরাধীদের আস্তানায় পরিণত হয়। বহিরাগত চোর ও সচিবালয়ের কর্মচারীদের যোগসাজশে এসব চুরি হয়। চুরির তালিকায় রয়েছে টিভি, ক্যাসেট, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল। গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো অনেক সময় চুরি করে ধ্বংস করে দেয়া হয়।’

সচিবালয়ে ফাইল চুরির এ ধরনের শত শত ঘটনার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে দৈনিক আমাদের বার্তার পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার মতামত জানার চেষ্টা করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি সেনসিটিভ, তদন্তাধীন তাই এখনই কোনো মন্তব্য করা যাবে না।’

সাবেক শিক্ষাসচিব মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সচিবালয় থেকে কোনো কিছু চুরি যাওয়া দুঃখজনক। চুরি ঠেকাতে না পারা প্রশাসনিক অদক্ষতা।’ চুরি ঠেকাতে ডিজিটাল পদ্ধতি গ্রহণ করার তাগিদ দেন তিনি।

সচিবালয় বিটের সিনিয়র সাংবাদিক রেজা রায়হান দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘আসলে বরবারই এসব চুরির ঘটনা সরকার চেপে যায়, জানাজানি হয় না। চুরির সঙ্গে জড়িতরা রাঘববোয়াল, তাই তদন্ত-জিডিতেই আটকে থাকে।’

এদিকে সচিবালয়ে নথি চুরির কথিত অভিযোগে লাঞ্ছিত ও কারা নির্যাতিত সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম এবার ‘ফ্রি প্রেস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। এবছর ‘মোস্ট রেজিলিয়েন্ট জার্নালিস্ট’ শ্রেণিতে তাকে পুরস্কৃত করার ব্যাখ্যায় ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড বলেছে, ‘তিনি তার দেশের স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম প্রকাশ্যে এনেছেন এবং এখন তাকে নিজের দেশে বিচার আর দুর্বিপাকের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.