শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও এখন শিক্ষকদের বড় নেতা - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও এখন শিক্ষকদের বড় নেতা

SS iT Computer

শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও এখন শিক্ষকদের বড় নেতা: স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—শিক্ষাজীবনের কোনো পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। স্নাতক-স্নাতকোত্তরের ফলাফলে ব্যাচের মধ্যে তার অবস্থান ছিল পেছন সারির দিকে। ফার্স্ট অথর হিসেবে লিখেছেন, এমন কোনো গবেষণা নিবন্ধের খোঁজ পাওয়া কঠিন। এমনকি তার পিএইচডি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

যদিও শিক্ষাগত যোগ্যতার এমন দশা নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছেন নিজামুল হক ভূঁইয়া। একসময় প্রভাষক পদে নিয়োগের যোগ্যতা না থাকলেও তিনি এখন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের প্রভাবশালী অধ্যাপক। টানা তৃতীয়বারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন সব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনেরও।

যদিও শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা শিক্ষকদেরই সমিতির নেতৃত্বে থাকা বাঞ্ছনীয়। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা ও গবেষণায় পেশাগত উত্কর্ষ রয়েছে এমন শিক্ষকদেরই এ সমিতির নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল। যদিও শিক্ষক রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকেই দলীয় বিবেচনায় নেতৃত্ব নির্বাচন হয়। একাডেমিক এক্সিলেন্সির বিষয়টি এক্ষেত্রে কখনই অগ্রাধিকার পায়নি।

সহকর্মী ও পরিচিতরা বলছেন, শিক্ষক পদে যোগদানের যোগ্যতা না থাকায় একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন নিজামুল হক ভূঁইয়া। পরবর্তী সময়ে পরিচয় ও সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে শিক্ষক পদে যোগ দেন তিনি। একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক পদে চাকরি নিয়মিতকরণ হয় তার। এরপর সময়ের পরিক্রমায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের তুষ্ট করেই এগিয়ে চলা নিজামুল হকের। সর্বশেষ কয়েক বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক পরিচয়ের আড়ালে অন্ধকার এক জগৎ গড়ে তুলেছেন নিজামুল হক ভূঁইয়া। জালিয়াতি, প্রতারণা ও অনৈতিক উপায়ে মালিক হয়েছেন অর্থবিত্তের। শিক্ষক পরিবারে সাদামাটা জীবনযাপনে বেড়ে ওঠা নিজামুল হক এখন ঢাকা, বোট, গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত শ্রেণীর ক্লাবের সদস্য। এর মধ্যে তিনি বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটিতেও রয়েছেন। তিনি এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিক।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নোয়াখালীর বজরা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন নিজামুল হক ভূঁইয়া। পরে চৌমুহনী কলেজ থেকে সেকেন্ড ডিভিশন নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন মৃত্তিকাবিজ্ঞান (বর্তমানে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ) বিভাগ থেকে ১৯৮২ ব্যাচে স্নাতক ও ১৯৮৩ ব্যাচে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ফলেও তিনি দ্বিতীয় বিভাগ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। এরপর ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সের (আইএনএফএস) ডিপ্লোমা কোর্স ও এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন নিজামুল হক। কর্মজীবনে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএনএফএসেই গবেষণা সহযোগী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে নিজামুল হক ভূঁইয়া অ্যাডহক ভিত্তিতে আইএনএফএসের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, এক মাসের জন্য উপাচার্য পদে এসে অধ্যাপক শহীদ উদ্দিন আহমেদ অঞ্চলপ্রীতিতে নিজামুল হককে নিয়োগ দেন। এরপর একই অঞ্চলের আরেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী তার নিয়োগ নিয়মিত করেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন নিয়োগ নীতিমালায়ও প্রভাষক পদে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনে ন্যূনতম একটি প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক ছিল।

শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের যোগ্যতাসহ অন্যান্য অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, শিক্ষক পদে যোগদান করতে হলে ন্যূনতম একটি প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক ছিল, এটা সত্য। ওনার (নিজামুল হক) ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, সেটা তো এখন বলা যাবে না। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কী শর্ত ছিল, সেটা যাচাই করে দেখার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ হয় সিলেকশন-সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে। অনেকগুলো ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে হলে অবশ্যই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেটা অনিয়ম।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘যথাযথ যোগ্যতার ভিত্তিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিয়োগ সম্পন্ন হয়। নতুন ইনস্টিটিউটে নিয়োগের সময় অনেক শর্তই শিথিল করা হয়। এছাড়া আমি সেখানে গবেষক হিসেবেও কাজ করেছি। আমার মতো একাডেমিক রেজাল্ট নিয়ে আরো অনেকেই শিক্ষক হয়েছেন। আমার প্রকাশনার সংখ্যা ৩৫।’

তিনি বলেন, ‘আমি কোনো জমি বা ফ্ল্যাটের ব্যবসা করি না। আমার পরিচিত একজনের প্রকল্পে কয়েকজন শিক্ষক ফ্ল্যাট কিনেছেন। এরই মধ্যে শিক্ষকদের দুটি গ্রুপ ফ্ল্যাট বুঝে পেয়েছে। বাকি একটি গ্রুপকে বুঝিয়ে দিতে একটু সময় লাগছে। সেখানে আমারও একটি ফ্ল্যাট বুকিং দেয়া রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর পদে রয়েছেন। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতির প্রয়োজন নেই। আর আমি দুটি ক্লাবের অনারারি মেম্বার। বাকি দুটিতে চাঁদা দিয়ে সদস্য হয়েছি। এতে দোষের কিছু রয়েছে বলে মনে করি না।’

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.