জরাজীর্ণ ঢাবি গ্রন্থাগার, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

জরাজীর্ণ ঢাবি গ্রন্থাগার, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

SS iT Computer

জরাজীর্ণ ঢাবি গ্রন্থাগার, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা: প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জ্ঞানমন্দির ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানসহ এর রয়েছে সুদীর্ঘ, সুবিশাল এবং গৌরবময় একশ বছরের এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের এক বিরাট অংশ ধরে রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের ১২টি বিভাগের অধীনে ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী এবং প্রায় ১৮ হাজার বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে যাত্রা শুরু করে।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ এবং ১৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তরোত্তর বিভাগ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি গ্রন্থাগারের আসন সংখ্যা, নেই আধুনিকায়ন। গ্রন্থাগারের সাইবার সেন্টারে পড়ে আছে ৩০টি অকেজো কম্পিউটার। গ্রন্থাগার সম্প্র্রসারণের নেই কোনো উদ্যোগ। ইতোপূর্বে লাইব্রেরিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া শব্দদূষণ, টয়লেট থেকে আসা দুর্গন্ধ, শৌচাগারের সমস্যা, ফটোকপি মেশিনের অপ্রতুলতা, অদক্ষ কর্মচারী, প্রয়োজনীয় বই না পাওয়াসহ রয়েছে নানা অভিযোগ। লাইব্রেরির প্রধান সমস্যা হচ্ছে তীব্র সিট সংকট।

গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. মো. নাসিরউদ্দীন মুন্সী বলেন, বিজ্ঞান অনুষদ, ই-লাইব্রেরিসহ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের মোট সিট সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। ঢাবি কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু অনার্স-মাস্টার্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার। হিসাব করলে দেখা যায়, গ্রন্থাগারে প্রতি সিটের জন্য অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীই লড়ছে ১৯ জন। এ যেন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধকে হার মানাচ্ছে। অথচ গ্রন্থাগারে নিয়মিত আসন দখল করা বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই সাবেক ছাত্র, যারা বিসিএস পরীক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী।

প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আমাদের গণরুমে থাকতে হয়। যে কারণে ঘুমাতে অনেক দেরি হয়। ফলে লাইব্রেরিতে আমরা পড়ার সুযোগ পাই না। কারণ ভোর ৬টার দিকে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নিতে হয় লাইব্রেরিতে আসন দখল করার জন্য। সাড়ে ৭টার পর গেলেই আর আসন পাওয়া যায় না। যে সিটে কেউ বসে নেই সেই সিটটাও বন্ধু, ছোটভাই বা বড়ভাইয়ের জন্য ব্যাগ বা বই দিয়ে দখলে রাখা হয়। ফলে সারাদিন যদি আসনটি ফাঁকাও পড়ে থাকে তাতে কেউ বসতে পারে না। এই তীব্র শীতের সকালেও শিক্ষার্থীদের লাইনে দাঁড়িয়ে আসন নিতে হয়। লাইব্রেরি থেকে প্রতিদিন লাইন ডাকসু এমনকি কলা অনুষদকে ছাড়িয়ে যায়।

গ্রন্থাগারে নেই নিয়মিত চেকিংয়ের ব্যবস্থা। ফলে লাইব্রেরিতে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটে বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে গ্রন্থাগারিক বলেন, এ রকম অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। যদি বাইরের কেউ অনুপ্রবেশ করে তাহলে আমাদের কাছে কেনো ধরিয়ে দেয়া হয় না। এ রকম কয়েকজনকে ধরিয়ে দিলে বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া যায় এবং আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি। মূলত বহিরাগতদের চেয়ে বেশি প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের বন্ধুরা।

তারা হেসে খেলে লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে। কাউকে বাইরের বলে বোঝা যায় না। আর লাইব্রেরির সিট সংকটের ব্যাপারে আমরা সবাই জানি। কিন্তু লাইব্রেরির যে অবকাঠামো তাতে সিট সংখ্যা বৃদ্ধি করার কোনো উপায় নেই। আমরাও চাই লাইব্রেরির অবকাঠামোগত উন্নয়ন হোক।
গত ১০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গ্রন্থাগারে নতুন কোনো বই বা জার্নাল যুক্ত করতে পারেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভাগকেন্দ্রিক বই কেনার চিত্রও খুবই হতাশাজনক। কিন্তু গ্রন্তাগার কর্তৃপক্ষ জানায় এটা ভুল। কারণ আমরা প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার বই ক্রয় করে থাকি। ক্রয়কৃত প্রতিটি বইয়ের অনেকগুলো কপি বিভিন্ন বিভাগের সেমিনারে পাঠানো হয়। বর্তমান এখানে সাড়ে ৬ লাখের বেশি বই ও সাময়িকী আছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় বই না থাকায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীর চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে গ্রন্থাগারটি।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তির ও ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সাইবার সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও আস্তে আস্তে তা নুইয়ে পড়ে। অকেজো কম্পিউটারের জায়গায় নতুন কম্পিউটার স্থাপন না করায় সবগুলো কম্পিউটার অকেজো হয়ে পড়ে, ফলে থমকে যায় সাইবার সেন্টার। পরে কোরিয়ান দূতাবাসের সহযোগিতায় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৩০টি কম্পিউটার সংযোগ দেয়া হয়। যেগুলো আবার অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ২০১৯-২০ সেশনে এসে মাত্র ৩টি সচল কম্পিউটারের সংযোগ দিয়েছিল গ্রন্থাগার। এই ৩টি সচল কম্পিউটার বাদে বাকি সব কম্পিউটার অকেজো হয়ে পড়ে আছে স্তূপাকারে।

গ্রন্থাকারীকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাইবার সেন্টারে এখন তেমন কম্পিউটার নেই। আমরা সাইবার সেন্টার বলতে কিছু রাখব না। এখানে নতুন কার্যকরী তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গবেষণাগার গড়ে তোলা হবে। আগে কম্পিউটার ব্যবহার করতে হলে ৫ ঘণ্টার জন্য ৬০ টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হতো। কিন্তু আমরা গবেষণামূলক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ই-জোন গড়ে তুলতে যাচ্ছি। যা বাস্তবায়িত হলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার্থীরা এখানে বসে রিচার্স করতে পারবে। কিন্তু কবে নাগাদ তা বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করেননি।

শতবর্ষে এসেও ঢাবি গ্রন্থাগারের দুর্দশা, অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন, জরাজীর্ণতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, গ্রন্থাগারে সিট সংকট থাকলেও শিক্ষার্থীরা তাদের বিভাগীয় সেমিনার, হলের পাঠকক্ষে বসে পড়াশোনা করতে পারছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোর জন্য ভালো গ্রন্থাগার দরকার। এইসব সমস্যা সমাধানে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, তা আমাদের হাতে। তবে এই মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন কবে নাগাদ হবে সেই বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

দ্রুত আধুনিক ও যুগোপযোগী বহুতল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা, সমস্যা সমাধানে গ্রন্থাগার ভবন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো একটি ভবন অস্থায়ীভাবে গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা, গ্রন্থাগারে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি নির্মাণ করার দাবিতে বেশ কয়েকবার মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগও ঢাবি গ্রন্থাগার আধুনিক, যুগোপযোগী, মানসম্মত, ডিজিটাল ও ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণে সক্ষম কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি কমপ্লেক্স করার দাবিতে মানববন্ধন করেছিল।

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.