জনপ্রশাসনে দণ্ড মওকুফের হিড়িক - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

জনপ্রশাসনে দণ্ড মওকুফের হিড়িক

SS iT Computer

জনপ্রশাসনে দণ্ড মওকুফের হিড়িক: মাঠ প্রশাসনে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জমা হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু অভিযোগগুলোর বড় অংশই চাপা পড়ে যাচ্ছে। এরপরও দুই-একটি অপরাধের শাস্তি হলেও পরে রাষ্ট্রপতি তাদের দণ্ড মওকুফ করছেন। অভিযোগ তদন্তও করছেন নিজ ক্যাডারেরই সিনিয়র কর্মকর্তারা। তদন্তের নামে নানা কৌশলে অভিযুক্ত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চলছে দণ্ড মওকুফ ও অব্যাহতির হিড়িক।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে কেবল সেসব ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। তাই দুর্নীতি নির্মূল করতে অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা তদন্তের সাথে যুক্ত তাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন অপরাধ করে কেউ ছাড়া না পায়, আবার নিরপরাধ কারো যেন শাস্তি না হয়। ঢালাওভাবে দণ্ড মওকুফের বিষয়টি সুশাসনের পরিপন্থী। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দণ্ড মওকুফ করা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মোসলেহ উদ্দীন বলেন, বিভাগীয় মামলায় দেয়া দণ্ড মওকুফ করা হলে এক দিকে অসৎ কর্মকর্তারা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে, অন্য দিকে ভালো কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিতে পারে। ফলে জনপ্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়বে। এ জন্য দণ্ড একেবারে মওকুফ না করে গুরুদণ্ড পাওয়া কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড দিয়ে শাস্তি কমানো যেতে পারে।

নাটোরের ডেপুটি রেভেনিউ কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অর্ধবঙ্গেশ্বরী রানী ভবানী দীঘির দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের জন্য উপসচিব (বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা- ওএসডি) নাজমুন নাহার মান্নুকে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী লঘুদণ্ড দিয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এতে বলা হয়, নাজমুন নাহার মান্নু ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ২০০৭ সালের ৫ জুন পর্যন্ত নাটোরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ডেপুটি রেভিনিউ কালেক্টর হিসেবে কর্মরত থাকাকালে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছ চাষের জন্য নাটোর আধুনিক মৎস্যচাষ প্রকল্প লিমিটেডের অনুকূলে ১০ বছরের জন্য বন্দোবস্তকৃত নাটোর সদর উপজেলাধীন ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ৬০০৪, ৬৯৪৩ ও ৮৫১৭ নং দাগে অবস্থিত ২৭ দশমিক ১৬৯৬ একর আয়তন বিশিষ্ট অর্ধবঙ্গেশ্বরী রানী ভবানী দীঘির দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত প্রস্তাব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে অগ্রায়ন করা এবং পরবর্তীকালে জেলা প্রশাসক তা অনুমোদন দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগ এনে বিভাগীয় মামলা করা হয়। গত ১৭ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে নাজমুন নাহার মান্নুর বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে তাকে দুই বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়।
দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল আবেদন পেশ করলে রাষ্ট্রপতি বেগম নাজমুন নাহার মান্নুর (পরিচিতি

নম্বর-৬৩৩৪) আপিল আবেদন বিবেচনা করে পূর্বে প্রদত্ত দুই বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ড মওকুফ করে তাকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এ ছাড়াও তিনি নরসিংদী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কর্মরত সময়ে টাকা নিয়ে চাকরি না দেয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কথা বলে টাকা আদায়সহ নানা ধরনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি। এ মামলাটির তদন্ত শেষ হয়নি তিন বছরেও।

এর আগে বালুমহাল ইজারার টাকা সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যায় মৌলভীবাজার ও নীলফামারীর সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজিয়া শিরিনের বিরুদ্ধে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেলে বিভাগীয় মামলা শেষে তাকে লঘুদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে নাজিয়া শিরিন রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলে রাষ্ট্রপতি নাজিয়া শিরিনের আপিল আবেদন বিবেচনা করে আগে প্রদত্ত দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার সাজা বাতিল করে তাকে দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।

গত ২৩ নভেম্বর কুড়িগ্রামের আলোচিত সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে দেয়া লঘুদণ্ড মওকুফ করে সরকার। অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এর আগে তার দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়। মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দীর্ঘ দিন তদন্ত শেষে অভিযুক্ত সুলতানা পারভীনকে এই শাস্তি দেয়া হয়েছিল।

মো: ইকরামুল হক সরকার (পরিচিতি নম্বর-৭৯৮৬), প্রাক্তন ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল, নোয়াখালী বিভাগ, তিনি বর্তমানে উপসচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন। বিগত ০৮-০৪-২০১৩ থেকে ২৭-১২-২০১৭ তারিখ পর্যন্ত তিনি ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল, নোয়াখালী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার দায়িত্ব পালনকালে নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুরের খিলপাড়া ও দত্তপাড়া ডাকঘরে যথাক্রমে ২০ কোটি ৩৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কর্তৃক দুই সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি কর্তৃক অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে আলোচ্য ডাকঘর দু’টিতে যথাযথ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি মর্মে মন্তব্য রয়েছে। প্রতিবেদনে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে যাদের নাম বলা হয়েছে তাদের মধ্যে সাবেক ডেপুটি পোস্টমাস্টার নোয়াখালী মো: ইকরামুল হক সরকার অন্যতম। তার এমন আচরণ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর শামিল।

২০২০ সালের ১১ জুন ‘অসদাচরণ’ অভিযোগে রুজুকৃত বিভাগীয় মামলার লিখিত জবাব দাখিলপূর্বক ব্যক্তিগত শুনানি প্রার্থনা করলে ৬ আগস্ট ২০২০ তারিখে অনুষ্ঠিত ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং শুনানিতে প্রদত্ত তার মৌখিক বক্তব্য ও লিখিত জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিভাগীয় মামলাটি তদন্ত করার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে ইকরামুল হক সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী আনীত ‘অসদাচরণের’ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি মর্মে মতামত প্রদান করা হয়। অবশেষে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাবিটা প্রকল্পের অর্থায়নে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর অধীন প্রথম পর্যায়ে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মানিকদিপা পলিপাড়া এলাকায় খাসজমিতে গৃহহীনদর জন্য ৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় করা হয় ১৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। গত ২৩ জানুয়ারি গৃহহীনদের মধ্যে ঘরগুলো হস্তান্তর করা হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরগুলো তৈরির পরপরই পানিতে ডুবে যায়।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা পারভীনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিভাগীয় মামলার শুনানি শেষে গত ১০ অক্টোবর তাকে দায়মুক্তি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.