ছাত্রলীগ না করায় শিক্ষার্থীকে সারা রাত নির্যাতন - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

ছাত্রলীগ না করায় শিক্ষার্থীকে সারা রাত নির্যাতন

SS iT Computer

ছাত্রলীগ না করায় শিক্ষার্থীকে সারা রাত নির্যাতন: ছাত্রলীগের রাজনীতি না করায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) এক শিক্ষার্থীকে রাতভর হলে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার সকালে ওই শিক্ষার্থীকে আহত অবস্থায় ত্রিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। এর আগে গত রবিবার রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ৩২৪ নম্বর কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়ালিদ নিহাদের ওপর নির্যাতনের ওই ঘটনা ঘটে।

এদিকে ওয়ালিদ নিহাদকে নির্যাতনের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন জাককানইবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে (আজ দুপুর ২টা) অপরাধীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আল্টিমেটামসহ সাত দফা দাবি জানিয়ে গতকাল দিনভর ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।

সহপাঠীরা জানান, নিহাদকে ধরে নিয়ে গিয়ে পিঠে ও মাথায় গুরুতর আঘাত করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি বেশ কয়েকবার বমি করেছেন। এ বিষয়ে নিহাদ বলেন, ‘আমি কেন ছাত্রলীগের গ্রুপভিত্তিক রাজনীতি করি না এ অভিযোগেই মূলত আমাকে ডাকা হয়। আমাকে নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে আমার বুকে রামদা ধরা হয়। খালেদা জিয়ার ছবি আমার ফেইসবুকে আপলোড দেওয়ানো হয়। আমার একটা ভিডিও ধারণ করে জোরপূর্বক বলানো হয়, ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। তারেক জিয়া দেশে ফিরবে। তখন ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্রলীগের কুত্তা থাকবে না।’

নির্যাতনের ঘটনায় ওয়ালিদ নিহাদ রেজিস্ট্রার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পলাশ ভাই আমাকে হলে নিয়ে যায় এবং যাওয়ার সাথে সাথেই আমাকে থাপ্পড় মারে নাট্যকলা বিভাগের হিমেল ভাই। আমার বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের তুহিন ভাই, ২০১৪-১৫ সেশনের মুমিন ভাই, একই বিভাগের অ্যালেক্স সাব্বির ভাই, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের তানভীর ভাইসহ আরও পাঁচ-ছয়জন টানা লাথি-ঘুসি মারতে থাকে। সাথে ফোকলোর বিভাগের যাযাবর নাঈম (আবু নাঈম আব্দুল্লাহ) ভাই লাথি-ঘুসি মারতে থাকে। গলায় ও বুকের ওপর দাঁড়িয়ে অনেক মেরেছে নাঈম ভাই। আমি কেন রাকিব ভাইয়ের রাজনীতি করি না। আমি নাকি অন্যদেরও রাজনীতি করতে বাধা দিয়েছি, যা ভিত্তিহীন।’
লিখিত অভিযোগে তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক সমস্যার কারণেই আমার রাজনীতি করা সম্ভব নয়। আমি পড়াশোনা নিয়েই থাকতে চাই। কিন্তু আমাকে ক্যাম্পাসে থাকতে হলে নাকি রাজনীতি না করে উপায় নেই। একপর্যায়ে নাট্যকলার হিমেল ভাই আমার হাতে রামদা দিয়ে আমাকে যাযাবর নাঈম ভাইয়ের কাছে রাজনীতি করব বলে পা ধরে মাফ চাইতে বলে। কোনো শিক্ষকের কাছে বিচার নিয়ে যাবি না। রাকিব ভাই চাইলে ভিসি পরিবর্তন হয়। বেশি কথা বললে ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করতে পারবি না, আবরারের (ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ) মতো মরবি।’

ওয়ালিদ নিহাদকে নির্যাতনের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গতকাল সকালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের দরজা আটকে দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে দুপুর ২টায় বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা প্রদক্ষিণ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে তারা তাদের অভিযোগ ও দাবিগুলো তুলে ধরেন। পরে গতকাল রাত ৯টার দিকে ক্যাম্পাসে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

নিহাদকে নির্যাতনে জড়িত ছাত্রলীগ নেতা আবু নাঈম আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে এর আগে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। তাদেরই একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ ফরিদ গতকাল এ বিষয়ে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাকে টর্চার সেলে ডেকে নিয়ে পেটানোর পাশাপাশি ইলেকট্রিক শক দেন নাঈম।

নিহাদকে নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু হলের প্রভোস্ট মাসুম হাওলাদার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সাত দফা দাবির মধ্যে হলসংশ্লিষ্ট যে বিষয়গুলো রয়েছে এবং হলকে আরও নিরাপদ করতে যা যা প্রয়োজন তা হল প্রশাসন করবে। এর জন্য জরুরি সভা আহ্বান করেছি। আজই (গতকাল সোমবার) সভা হবে। হলসংশ্লিষ্ট দাবিগুলো আমরা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করব।’

নিহাদকে নির্যাতনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে হল প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সেই কমিটিকে আজ দুপুর ১টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে বলেও জানান প্রভোস্ট মাসুম হাওলাদার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. উজ্জ্বল কুমার প্রধান বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক, এ জায়গায় কোনো ছাড় হবে না। বিধি অনুযায়ী দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। যেহেতু শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছে। সেই কথাটি বিবেচনায় নিয়ে এর মধ্যেই জরুরি প্রক্টরিয়াল বডির সভা করে বিধি মোতাবেক যা করা যায় আমরা সেদিকেই যাব। এখানে অপরাধীর পরিচয় কিংবা অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হবে না।’

নিহাদকে নির্যাতনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘যদি প্রমাণিত হয় এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কেউ জড়িত তখন অবশ্যই তার বা তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.