চাঁদপুর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ : হাইকোর্টে জাল তথ্য দাখিল - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

চাঁদপুর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ : হাইকোর্টে জাল তথ্য দাখিল

SS iT Computer

চাঁদপুর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ : হাইকোর্টে জাল তথ্য দাখিল চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রশাসনিক বাধার মুখে আটকে যাওয়ার পর এ বিষয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা পৃথক রিটের শুনানি শুরু হয়েছে। যে ফিল্ম সিটিকে কেন্দ্র করে ল²ীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম খান বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, গতকাল সোমবার শুনানিকালে সেই ফিল্ম সিটি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আদালতে ফিল্ম সিটি অনুমোদনসংক্রান্ত জাল ও সৃজিত কাগজপত্র দাখিল করেছেন সেলিম খান। মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন কবির হোসেন।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, বিষয়টি আদালতের দৃষ্টিতে আনেন রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা। এ ছাড়া আইনের তোয়াক্কা না করে ‘সিনেবাজ ফিল্ম সিটি কাম রিসোর্ট কাম রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং’-এর নকশা নিজেই অনুমোদন দিয়েছেন এই চেয়ারম্যান। আজ মঙ্গলবার বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আবারও শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

গতকাল শুনানি শেষে জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ব্যারিস্টার কাজী মাইনুল হাসান বলেন, ‘ফিল্ম সিটির অনুমোদন বিষয়ে অনেক জাল ও সৃজিত কাগজপত্র সেলিম খানের পক্ষ থেকে আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এগুলো আদালতের দৃষ্টিতে এনেছি। এসব জাল কাগজপত্রের বিষয়ে সেলিম খানের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর আসেনি। বিষয়টি নিয়ে শুনানি চলছে। আদালত যেটা ভালো, উপযুক্ত ও আইনানুগ মনে করবেন, সেই সিদ্ধান্ত দেবেন।’

রিটের শুনানিতে সেলিম খানের আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি আদালতকে বলেন, মন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে তার মক্কেল জমি অধিগ্রহণের জন্য আবেদন করেন। এর পর অনুমোদন হলো। এখানে স্বচ্ছতা (ক্লিন হ্যান্ড) আছে কিনা দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাড়ে ৬২ একর

জমি অধিগ্রহণের জন্য আইনের ৪ ধারায় ১৮২টি দলিলের বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ জারির পর সব দলিল বিবেচনায় নিতে হবে। ওই ১৩৯টি দলিল বাদ দিয়ে ডিসির দেওয়া আদেশ সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির জন্য যে ১৮২টি প্লট নির্বাচন করা হয়েছে, সেগুলোর প্রত্যেকটির নিজস্ব মূল্য আছে। সেগুলো সমন্বয় করে গড় হার নির্ধারণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে হবে।

শুনানিকালে আদালত বলেন, আইনটি পড়লে আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অধিগ্রহণের জন্য যে জায়গাটি নির্ধারণ করা হয়েছে, মূল্য নির্ধারণ করতে হবে তার আশপাশের জমির দাম বিবেচনায় নিয়ে। এ বিষয়ে আদালত ডিএজি কাজী মাইনুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি একমত পোষণ করেন। এ সময় আদালত আরও বলেন, উনার (সেলিম খানের উকিলের) কথা গ্রহণ করলে ব্যয় ৫৫৩ কোটি টাকা দাঁড়াচ্ছে। আর আপনারটা (ডিএজির) বিবেচনা করলে দাঁড়াচ্ছে ১৯৩ কোটি টাকা। এ সময় ডিএজি বলেন, এট সঠিক। এরপর ডিএজি ফিল্ম সিটির অনুমোদন ও জাল তথ্য দাখিল বিষয়ে আদালতের কাছে বক্তব্য তুলে ধরেন। কাজী মাইনুল হাসান আদালতে বলেন, জাল-জালিয়াতির তথ্য দাখিল করে তারা সম্পূরক এফিডেভিট দাখিল করেছেন। তাতে বলেছেন, কোনো মিথ্য তথ্য থাকলে তার জন্য সিনিয়র আইনজীবী দায়ী থাকবেন না। এ ধরনের আবেদন জীবনে কখনো দেখিনি।

এদিকে শুনানিতে উঠে এসেছে ফিল্ম সিটির অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো আইনের তোয়াক্কাই করা হয়নি। ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রæয়ারি ল²ীপুর ইউনিয়ন পরিষদের একটি সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন চেয়ারম্যান সেলিম খান নিজেই। সভাপতি সভায় জানান, ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রæয়ারি সেলিম খান, ‘গ্রাম ল²ীপুর হতে প্রস্তাবিত সিনেবাজ ফিল্ম সিটি কাম রিসোর্ট কাম রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং’-এর নকশা অনুমোদনের আবেদন পাওয়া যায়। যার অনুমোদন হলে পরিষদের আয় বাড়বে। এতে সর্বসম্মতি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সভায় উপস্থিত সদস্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করেন। এরপর সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অনুমোদন দেওয়া হয়।’

এ বিষয়ে ডিএজি আদালতকে বলেন, এই ফিল্ম সিটির অনুমোদন ছিল আইন ও বিধিবহিভর্‚ত। স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ২০০৯-এর অধীনে সরকার প্রণীত এক সার্কুলারে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন এলাকায় ইমারত/স্থাপনার নকশা অনুমোদন কিভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা ওই সার্কুলারে উপজেলা ও ইউনিয়নের ভবনের নকশা অনুমোদনের ব্যাপারে একটি কমিটি করা হয়। ১১ সদস্যের ওই কমিটির প্রধান হবেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। এ ছাড়া বাকি ১০ সদস্যের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একজন সদস্য হিসেবে থাকবেন। এ ছাড়া ওই সার্কুলারের ৩ নম্বর নির্দেশনায় (চ) এর ১ নম্বর ধারায় বলা হয়, ইমরাত নির্মাণের জন্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬-এর তফসিল-১ উল্লিখিত আবেদনপত্রে আদেন করতে হবে। আবেদনপত্র দাখিলের পর কমিটি সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নকশার অনুমোদন করবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান তার নিজের ফিল্ম সিটির অনুমোদন নিজেই দিয়েছেন।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ২০০৯-এর ৪৩ ধারায় বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যেক সভার সম্পাদনীয় কার‌্যাবলির একটি তালিকা, সভা অনুষ্ঠানের নির্ধারিত তারিখের সাত দিন পূর্বে পরিষদের প্রত্যেক সদস্যের কাছে পাঠাতে হবে। তালিকাবহিভর্‚ত কোনো বিষয় সভায় আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা যাবে না। তবে চেয়ারম্যান জরুরি মনে করলে সদস্যদের কমপক্ষে তিন দিনের নোটিশ প্রদানের পর এরূপ একটি সভা করতে পারবেন। কিন্তু সেলিম খানের ফিল্ম সিটির নকশার অনুমোদনের জন্য এমন সময় দিয়ে কোনো নোটিশ সদস্যদের দেওয়া হয়নি। তিনি যেদিন আবেদন করেছেন, সেদিনই ফিল্ম সিটির অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়া এই আইনের ৪৪ ধারার ৪ নম্বর উপধারায় বলা আছে, পরিষদের প্রত্যেক সভার কার্যবিবরণী স্বাক্ষরিত হওয়ার পর যত দ্রæত সম্ভব পরিষদের সব সিদ্ধান্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর পাশাপাশি এর অনুলিপি ডেপুটি কমিশনারের কাছে পাঠাতে হবে। কিন্তু ফিল্ম সিটি যে সভায় অনুমোদন হয়েছে, সেই সভার রেজুলেশন ইউএনও ও ডিসির কাছে পাঠানো হয়নি। এভাবে জাল-জালিয়াতি ও বেআইনি কর্মকাÐ পরিচালনা করেও ওই চেয়ারম্যান এখনো নির্বিঘেœ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার চেয়ারম্যান পদ থাকা উচিত নয় বলে ডিএজি আদালতকে জানান। পরে আদালত জমি অধিগ্রহণ আইনের ৯ (১) (ক) ধারার প্রয়োগের ব্যাপারে জানতে চান। ডিএজি এই পয়েন্টে আজ আদালতের কাছে বক্তব্য তুলে ধরবেন বলে আদালতকে জানান।

জানা যায়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন মন্ত্রিসভা থেকে চ‚ড়ান্তভাবে অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর। জাতীয় সংসদে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয় ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের খবর পেয়ে ২০২০ সালের মে থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত ১৩৯টি উচ্চমূল্যের জমির দলিল করে সেলিম খানসহ চার-পাঁচজনের একটি সিন্ডিকেট। এরপর দলিল সম্পাদন করে ক্রয়কৃত ওইসব জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ভ‚মি অধিগ্রহণ করতে সেলিম খান গত বছরের ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখেন। এরপর সে অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের ৬ এপ্রিল। প্রশাসনিক অনুমোদন পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য সিন্ডিকেটের ১৩৯টি দাগসহ ১৮২টি দাগ চ‚ড়ান্ত করে অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে প্রস্তাব করে। এরপর জমির মূল্যহার নির্ধারণ করতে গিয়ে সিন্ডিকেটের অনিয়মের আয়োজনের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে। এ বিষয়ে তদন্ত করে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) অঞ্জনা খান মজলিশ গত বছরের ১৬ নভেম্বর একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনের ৪ ধারায় নোটিশ জারির পূর্বের ১২ মাসের সব দলিল বিবেচনায় নিলে মোট প্রাক্কলন দাঁড়ায় ৫৫৩ কোটি ৭ লাখ ৭ হাজার ২৯০ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ের অধিগ্রহণ প্রস্তাবিত ও পূর্বে অধিগ্রহণকৃত দাগ ব্যতীত দলিল বিবেচনায় নিলে মোট প্রাক্কলন দাঁড়ায় ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৭ টাকা। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, অধিগ্রহণ প্রস্তাবিত দাগসূচির ভ‚মি হস্তান্তর ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর মাধ্যমে ভ‚মির মূল্যহার চরম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াবে ৩৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৭৮২ টাকা। পরে জেলা প্রশাসক ১৮২টি দলিলের মধ্যে উচ্চমূল্যের ১৩৯টি দলিল বাদ দিয়ে ৪৩ দলিল গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ১১৫ নম্বর ল²ীপুর মৌজার অন্যান্য দলিল বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৬২ একর জমির জন্য ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৭ টাকা প্রাক্কলন প্রস্তুত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে প্রদান করেন।

এরই মধ্যে সিন্ডিকেট কর্তৃক সম্পাদিত ১৩৯টি দলিল বিবেচনায় নিতে সেলিম খান ভ‚মি সচিব বরাবর আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদনেও কাজ না হওয়ায় প্রথমে সিন্ডিকেটের সদস্য জুয়েল হাইকোর্টে একটি রিট করেন। পরবর্তী সময়ে সেলিম খানসহ দুজন আরও একটি রিট করেন। রিটে ডিসির পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি এবং ভিসিকে প্রাক্কলনের ১৯৩ কোটি টাকা ছাড়ের প্রস্তাব অবৈধ ঘোষণার দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া ভ‚মি অধিগ্রণ আইনের ৯ (১) (ক) ধারা অনুযায়ী প্রাক্কলন নির্ধারণ করার নির্দেশনা চাওয়া হয়।

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.