এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ ভুয়া পিএইচডিধারী শিক্ষক - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ ভুয়া পিএইচডিধারী শিক্ষক

SS iT Computer

এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ ভুয়া পিএইচডিধারী শিক্ষক: নিজেকে ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি) ডিগ্রিধারী দাবি করছেন, তবে তা প্রমাণের জন্য নেই কোনো ধরনের গবেষণা অভিসন্দর্ভ (থিসিস)। যে প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন, সেটির বৈধতাই নেই। কেউ আবার অনুমোদনহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করেছেন পিএইচডির সনদ। এমন অনুমোদনহীন ও ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী ছয় শিক্ষকের সন্ধান মিলেছে রাজধানীর প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভুয়া ও অনুমোদনহীন এসব সনদ নিয়েই এ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পাঠদান করছেন তারা। মঙ্গলবার (২ অক্টোবর) বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন সাইফ সুজন।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের তিনজনই রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে কর্মরত। তারা হলেন অধ্যাপক রেবেকা সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক শিকদার মো. আনোয়ারুল ইসলাম ও মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। দুজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে কর্মরত। তারা হলেন সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন ও আবু সাঈদ মিয়া। বাকি একজন ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান আতিকুর রহমান খান (এআর খান)।

এদের মধ্যে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়া রেবেকা সুলতানার জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ১৯৭৬ সালে। এরপর ২০০২ সালে ইবাইস ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ডিগ্রি এবং ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার অবসরপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তার এমবিএ ও পিএইচডি দুটি ডিগ্রিই ভুয়া। ইবাইস ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা পায় ২০০২ সালে। যেহেতু রেবেকা সুলতানা উদ্ভিদবিজ্ঞানে পড়েছেন, তাই তাকে অবশ্যই দুই বছরের এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বছরই তিনি এমবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন, বৈধভাবে যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর পিএইচডি ডিগ্রির প্রমাণ সাপেক্ষে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কোনো গবেষণা অভিসন্দর্ভ দেখাতে পারেননি তিনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ‘প্রেস্টন ইউনিভার্সিটি’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। সেখানে অবস্থানরত অন্তত ১০ জন বাংলাদেশী শিকক ও শিক্ষার্থী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এমনকি ইন্টারনেটেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভুয়া ডিগ্রির পাশাপাশি সরকারি চাকরি থেকে অবসরের কয়েক বছরের মধ্যে রেবেকা সুলতানার অধ্যাপক বনে যাওয়া নিয়েও বেশ সমালোচনা রয়েছে।

ভুয়া ডিগ্রির বিষয়ে জানতে চাইলে রেবেকা সুলতানা বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার সব সনদ বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়া রয়েছে।

একইভাবে কোনো ধরনের গবেষণা অভিসন্দর্ভ না থাকলেও নিজেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী দাবি করছেন শিকদার মো. আনোয়ারুল ইসলাম। প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়া জীবনবৃত্তান্তে তিনি জাপানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের কথা উল্লেখ করেন। যদিও সংযুক্তি হিসেবে পিএইচডির যে সনদ দিয়েছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের রসবিলে ইউনিভার্সিটির নামে। পিএইচডি ডিগ্রির কোনো গবেষণা অভিসন্দর্ভ জমা দিতে পারেননি এ সহযোগী অধ্যাপক।

একই বিভাগের শিক্ষক নজরুল ইসলাম জীবনবৃত্তান্তে নিজেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী দাবি করেন। সেখানে যুক্তরাজ্যে বসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) ডিগ্রি অর্জনের কথা উল্লেখ করেন। যদিও ডিবিএ ডিগ্রিকে পিএইচডি মানের ডিগ্রি হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই। এছাড়া নজরুল ইসলাম লন্ডনভিত্তিক যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিবিএ ডিগ্রি করেছেন, যুক্তরাজ্যে এ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, আমি লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের মাধ্যমে অনলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দান ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করি। এ-বিষয়ক সব তথ্য আমার কাছে রয়েছে। আমি লন্ডনের যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিগ্রি নিয়েছি, সেটি ২০১২ সালে ওই দেশের সরকার বন্ধ করে দেয়। এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে কি সেখানকার সনদও অবৈধ হয়ে যাবে? এছাড়া আমার থিসিসও বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে।

যদিও প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের গবেষণা অভিসন্দর্ভ পায়নি।

বাকি তিন শিক্ষক বাংলাদেশে বসে অনলাইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন বলে দাবি করেন। যদিও এখন পর্যন্ত অনলাইনে অর্জিত পিএইচডি ডিগ্রির কোনো বৈধতা নেই। এর মধ্যে আবু সাঈদ মিয়া লাটভিয়ার নিউপোর্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করার দাবি করেন। এছাড়া হেলাল উদ্দিন ও আতিকুর রহমান খান আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অনলাইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কয়েক বছর আগে ঢাকাভিত্তিক পরিচালিত একটি স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে দেদার আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির পিএইচডি সনদ বিক্রি হয়। পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়।

অনলাইনে নেয়া পিএইচডি ডিগ্রির বিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুর রহমান বলেন, আমি একটি স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের অধীন আমার পিএইচডি থিসিস সম্পন্ন করি। আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে আমার পিএইচডির সনদ দেয়া হয়। একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারের অনেক উচ্চপদস্থ লোকও ডিগ্রি নিয়েছেন। এখন সরকার কিংবা নীতিনির্ধারকরা এসব ডিগ্রি বা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা না দিলে নাগরিক হিসেবে সেটি অবশ্যই পালন করব।

এদিকে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের বিষয়ে জানতে চাইলে নড়েচড়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মন্তব্য জানতে চাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সম্প্রতি দায়িত্ব নেয়া প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল। তিনি বলেন, ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি একদিকে যেমন অপরাধমূলক, অন্যদিকে গুণগত উচ্চশিক্ষারও অন্তরায়। কয়েকজন শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয়দের নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভায় গতকাল তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই সেটি বাস্তবায়ন হবে।

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.