আসন সংখ্যা অর্ধেক করে দৃষ্টান্ত গড়ল গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় - আজকের শিক্ষা || ajkershiksha.com

আসন সংখ্যা অর্ধেক করে দৃষ্টান্ত গড়ল গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়

SS iT Computer

আসন সংখ্যা অর্ধেক করে দৃষ্টান্ত গড়ল গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নতুন বিভাগ খোলার সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। এজন্য যথাযথ প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। বিভাগ খোলার প্রয়োজনীয়তার কথা ইউজিসিকে জানাতে হয়। তবে এর পরও প্রস্তুতি না নিয়েই কিংবা প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই নতুন নতুন বিভাগ খোলার অভিযোগ রয়েছে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। এ কারণে স্বাভাবিকভাবে প্রায় প্রতি বছরই শিক্ষার্থী ভর্তির আসন সংখ্যা বাড়াতে হয় সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে। বিভাগ ও শিক্ষার্থী আসন সংখ্যা বাড়ানোর বিপরীতে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি)। দুই শিক্ষাবর্ষের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের বিভিন্ন বিভাগে আসন সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমিয়ে এনেছে। মঙ্গলবার (২৮ ডিসেম্বর) বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন সাইফ সুজন।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, ১৫ ডিসেম্বর বশেমুরবিপ্রবির স্নাতক প্রথম বর্ষের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, এবার বিশ্ববিদ্যালয়টির আটটি অনুষদভুক্ত ৩৩টি বিভাগে মোট ১ হাজার ৫০৫টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এর আগের শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৩৭টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের অধীনে আসন সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৪৫। আর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থী আসন ছিল ২ হাজার ৯০৫টি। অর্থাৎ দুই শিক্ষাবর্ষের ব্যবধানে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির আসন সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনার আলোকে গুণগত উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতেই এ সংস্কার আনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুব বলেন, শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাবরেটরি সুবিধা বিবেচনায় বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের বিভাগগুলোয় এক শিক্ষাবর্ষে কোনোভাবেই ৪০ জনের বেশি ভর্তির সুযোগ নেই। যদিও আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখলাম, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বিভাগগুলোয় ৬০ থেকে ১০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণরূপে অবৈজ্ঞানিক। অন্য অনুষদগুলোতেও বিভাগ ভেদে ২০০ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোয় সর্বোচ্চ ৪০ ও এর বাইরের বিভাগগুলোয় সর্বোচ্চ ৬০ জন ভর্তি করানো হবে। এছাড়া আমরা বিভিন্ন অযৌক্তিক কোটায় ভর্তি বন্ধ করেছি। এসব সিদ্ধান্তের আলোকে শিক্ষার্থী আসন অর্ধেক কমানো হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের এ সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় সব বিভাগের আসন সংখ্যায়ই পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের অধীন বিভাগ ছিল ছয়টি। এর মধ্যে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফুড অ্যান্ড এগ্রোপ্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৬০টি করে শিক্ষার্থী আসন ছিল। বাকি থাকা কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৭০টি আসন ছিল ওই শিক্ষাবর্ষে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে এ বিভাগগুলোয় শিক্ষার্থী আসন রাখা হয়েছে ৪০টি করে। এছাড়া নতুন করে খোলা আর্কিটেকচার বিভাগে শিক্ষার্থী আসন রাখা হয়েছে ৩৫টি।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান অনুষদের অধীন পরিচালিত পাঁচটি বিভাগের মধ্যে গণিত, পরিসংখ্যান, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী আসন ছিল ৭০টি করে। বাকি থাকা পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগে শিক্ষার্থী আসন ছিল ১০০। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে এসে এর সবকটি বিভাগেই শিক্ষার্থী আসন ৪০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।

জীববিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে পাঁচটি বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ওই সময় এ অনুষদের ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি—এ তিন বিভাগে ৫০টি করে আসন ছিল। আর মনোবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী আসন ছিল যথাক্রমে ১০০ ও ৬০টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সিদ্ধান্তের আলোকে জীববিজ্ঞানের সব বিভাগের আসন সংখ্যা ৪০ নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে কৃষিতে ১৯৫, ফিশারিজ অ্যান্ড বায়োসায়েন্সে ৮০ ও লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগে ৫০টি করে আসন ছিল। বর্তমানে এর সব বিভাগেই ৪০টি করে শিক্ষার্থী আসন রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বাইরের অনুষদগুলোর বিভাগগুলোতেও শিক্ষার্থী আসনে অনেক বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে মানবিকের বিভাগগুলোর মধ্যে ইতিহাসে ২০০, বাংলায় ৯০ ও ইংরেজিতে ৭০টি আসন ছিল। এখন এ বিভাগগুলোর আসন সংখ্যা ৫০ করে। একই শিক্ষাবর্ষে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ২০০, সমাজবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ১০০টি করে; লোকপ্রশাসনে ৯০ ও অর্থনীতি বিভাগে ছিল ৭০টি আসন। এখন এ অনুষদের সব বিভাগেই আসন সংখ্যা ৬০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।

ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং—ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীন এ চারটি বিভাগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে আসন ছিল ৭০টি করে। ওই শিক্ষাবর্ষে একই অনুষদের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে আসন ছিল ৫০টি। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ব্যবসায় শিক্ষার সব বিভাগেই ৫০টি করে আসন সংখ্যা রয়েছে। এছাড়া আইনে আগে ১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও এখন সেটি ৫০ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী আসন কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন ডিন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাক্তন উপাচার্যের আমলে দেদার বিভাগ ও ইনস্টিটিউট খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল। এমনকি একই ধরনের বিষয়ে একাধিক বিভাগও খোলা হয়। কিন্তু তাদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ কিংবা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। সব মিলিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। এতসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদানে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুণগত শিক্ষার স্বার্থে সেটি অনেক কমিয়ে এনেছে। পাশাপাশি ইনস্টিটিউটগুলোয় স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া দুটি বিভাগকে একীভূত করা হয়েছে।

কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছে সরকার। পাশাপাশি পুরনোগুলোতেও প্রায় প্রতি বছরই নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণীক্ষক ও ল্যাবরেটরির সংকুলান না করেই শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেয়া হয় এসব বিভাগে। এছাড়া শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ানো হয় না আবাসন, যানবাহন ও চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা।

এমন পরিস্থিতিতে বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থী আসন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন উচ্চশিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, কমিশনের নির্দেশনা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকায় এত বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। প্রাসঙ্গিক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ সংস্কার আনা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত তাদের শিক্ষক সংখ্যা ও অবকাঠামো বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থী আসন নির্ধারণ করা। যদিও এ বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এতে মানসম্মত শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

বাছাইকৃত সংবাদঃ

Comments are closed.